সমাস
সমাস শব্দটি এসেছে সংস্কৃত "সম" এবং "আস" ধাতু থেকে, যার অর্থ "একসঙ্গে বসা"। দুটি বা ততোধিক পদ বা শব্দকে একত্রে মিশিয়ে একটি নতুন অর্থবোধক শব্দ গঠন করাকেই সমাস বলা হয়। সমাসের ফলে বাক্য সংক্ষেপিত হয় এবং ভাষা সহজ ও সাবলীল হয়ে ওঠে।
সমাসের প্রকারভেদ
সমাস প্রধানত ৬ প্রকারের। এগুলো হলো:
- তৎপুরুষ সমাস
- কর্মধারয় সমাস
- দ্বন্দ্ব সমাস
- দ্বিগু সমাস
- বহুব্রীহি সমাস
- অব্যয়ীভাব সমাস
১. তৎপুরুষ সমাস
যেখানে সমাসের পরপদ (শেষ পদ) প্রধান হয় এবং পূর্বপদ নির্ধারক বা বর্ণনাকারী হয়।
সংজ্ঞা:
যে সমাসে পরপদ প্রধান থাকে এবং পূর্বপদ দ্বারা পরপদের অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে।
উদাহরণ:
- গ্রামান্তর = গ্রামের অন্তর (অর্থাৎ অন্য গ্রাম)
- রাজপুত্র = রাজা + পুত্র (রাজার পুত্র)
চেনার প্রক্রিয়া:
সমাস বিচ্ছেদ করলে পরপদটি মূল শব্দ হিসেবে থাকে। যেমন:
‘রাজপুত্র’ = রাজা + পুত্র। এখানে "পুত্র" মূল।
সম্পাদন প্রক্রিয়া:
১. শব্দের পরপদ প্রধান কিনা নির্ণয় করুন।
২. পূর্বপদ দ্বারা পরপদের অর্থ ব্যাখ্যা হচ্ছে কিনা যাচাই করুন।
২. কর্মধারয় সমাস
যেখানে পূর্বপদ বিশেষণ বা বিশেষ্য এবং পরপদ সেই বিশেষণ বা বিশেষ্যের মূল পদ।
সংজ্ঞা:
যে সমাসে পূর্বপদ বিশেষণ বা বিশেষ্য হয় এবং পরপদ প্রধান পদ হয়, তাকে কর্মধারয় সমাস বলে।
উদাহরণ:
- নীলকমল = নীল + কমল (যে কমল নীল রঙের)
- সুকুমার = সু + কুমার (যে কুমার ভালো)
চেনার প্রক্রিয়া:
পূর্বপদ বিশেষণ বা গুণবাচক এবং পরপদ প্রধান হয়।
সম্পাদন প্রক্রিয়া:
১. বিশেষণ এবং বিশেষ্যের মধ্যে যোগসূত্র যাচাই করুন।
২. বিচ্ছেদে বিশেষণটি পূর্বে রাখুন।
৩. দ্বন্দ্ব সমাস
যেখানে দুটি পদই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং এর অর্থ দুই পদকেই বোঝায়।
সংজ্ঞা:
যে সমাসে উভয় পদ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং নতুন অর্থ তৈরি করে না, তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে।
উদাহরণ:
- রাম-লক্ষ্মণ = রাম এবং লক্ষ্মণ
- দিনরাত = দিন এবং রাত
চেনার প্রক্রিয়া:
পদ দুটি সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদের মধ্যে "এবং" অর্থ থাকে।
সম্পাদন প্রক্রিয়া:
১. পদ দুটির যোগে “এবং” যোগ করুন।
২. আলাদা করে উভয় পদকে স্বীকৃতি দিন।
৪. দ্বিগু সমাস
যেখানে সংখ্যাবাচক শব্দ দিয়ে নতুন বিশেষ্য শব্দ গঠিত হয়।
সংজ্ঞা:
সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে অন্য কোনো বিশেষ্য যোগ করে যে সমাস গঠিত হয়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে।
উদাহরণ:
- সপ্তসাগর = সাতটি সাগর
- ত্রিলোক = তিনটি লোক
চেনার প্রক্রিয়া:
পূর্বপদে সংখ্যা থাকবে এবং পরপদটি সংখ্যার বিষয়।
সম্পাদন প্রক্রিয়া:
১. সংখ্যাবাচক শব্দটিকে পূর্বে রাখুন।
2. পরপদ প্রধান করে অর্থ নির্ধারণ করুন।
৫. বহুব্রীহি সমাস
যেখানে সমাসিত পদ দুটি মিলে অন্য একটি পদকে নির্দেশ করে।
সংজ্ঞা:
যে সমাসে সমাসিত পদ দুটি মিলে তৃতীয় কোনো পদকে বোঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে।
উদাহরণ:
- পীতাম্বর = যে অম্বর (বস্ত্র) পীত (হলুদ রঙের)
- শ্বেতপত্র = যে পত্র (পাতা) শ্বেত (সাদা)
চেনার প্রক্রিয়া:
নতুন পদটি গঠিত হলে তার অর্থ তৃতীয় কোনো বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে।
সম্পাদন প্রক্রিয়া:
১. দুটি পদ মিলে নতুন অর্থ গঠন করছে কিনা যাচাই করুন।
২. বিচ্ছেদে তৃতীয় অর্থ নির্ধারণ করুন।
৬. অব্যয়ীভাব সমাস
যেখানে অব্যয় শব্দ যুক্ত হয়।
সংজ্ঞা:
যে সমাসে অব্যয় শব্দ যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন হয়, তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে।
উদাহরণ:
- অতএব = অতএব
- যথাসম্ভব = যথা + সম্ভব (যেমন সম্ভব)
চেনার প্রক্রিয়া:
পূর্বপদ অব্যয় এবং পরপদ বিশেষ্য।
সম্পাদন প্রক্রিয়া:
১. অব্যয় যোগ করে অর্থ নির্ধারণ করুন।
২. অব্যয়ের সঙ্গে বাক্যবিন্যাসের সাযুজ্য যাচাই করুন।
সমাসের উপযোগিতা
- বাক্য সংক্ষেপ: দীর্ঘ বাক্য সংক্ষিপ্ত হয়।
- অর্থ স্পষ্টতা: সমাসিত শব্দ দিয়ে বিষয় সহজে বোঝানো যায়।
- শব্দের সুষম গঠন: নতুন শব্দের মাধ্যমে ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়।
উদাহরণস্বরূপ:
“যে পুত্র রাজা” → “রাজপুত্র”
এভাবে সমাস ব্যবহার করে বাংলা ভাষায় শৈল্পিকতা এবং সংক্ষেপণ ঘটানো হয়।
No comments:
Post a Comment